শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৯ পূর্বাহ্ন

গল্প, চট্টগ্রাম, দেশ, প্রবাস, শিরোনাম, সাহিত্য

জলে যে আগুন দ্বিগুণ জ্বলে / কাজী জাহাঙ্গীর

রবিবার, ৮ মে, ২০২২ ৭৬০ Time View

অনার্স ক্লাসে ভর্তি হয়েছি কয়েক মাস হল মাত্র। সীমিত সংখ্যক আসনে সীমিত সংখ্যক ছেলে মেয়ে হওয়ায় ক্লাসে সবাই খুব কাছাকাছি, কিন্তু অন্তরের দিক থেকে ঠিকই কেমন যেন সবাই দূরে দূরে। বিশেষ করে মেয়েগুলো কেমন যেন নিজেদেরকে একটু সরিয়ে সরিয়ে রাখছে, আমি বুঝতে পারছিলাম যে কদিন আগে ছেলেদের নামে মেয়েদের দেয়া একটা খেতাব তালিকার বিপরীতে ছেলেদের পক্ষ থেকে আমরা যে খেতাব তাদের দিয়েছি সেটার আঁচ এখনো কাটেনি মেয়েদের মন থেকে। যদিও তারাই প্রথম ছেলেদের নামে খেতাব তালিকা লিখে ক্লাসরুমের দরজায় সাটিয়ে দিয়েছিলো। সম্পর্কের এরকম একটা সুনশান শীতল সময়ে একদিন মিঝুকে ডেকে বললাম-
-কিরে দেখছস, সবাই কেমন নিস্তেজ নিশ্চুপ হয়ে রয়েছে
-কী আর করবি, আমাদের খেতাব খেয়ে সবগুলা আউলায়ে গেছে, দেখ কতদিন যায় এভাবে।
-আচ্ছা ঐ যে তিতাস মেয়েটা যে আমাদের সাথে প্রথম থেকে বেশ কথা টথা বলতো, সেওতো দেখি বেঁকে আছে।
– আরে বুঝসনা কেন, সিটি কলেজ থেকে ঐ পাঁচজনের গ্রুপটাতো এখানে ডমিনেন্ট। ওদের সামনে বাকিগুলাতো পুটিমাছ, দেখসনা ঐ দুইটা কেমন ভয়ে ভয়ে পিছনে কোণায় কেমন গুটি সুটি মেরে বসে থাকে?
মিঝু ছেলেটা প্রথম থেকেই আমার বেশ কাছে কাছে বসত, যার কারণে ওর সাথে মনে হয় চট করেই আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ক্যাম্পাসে ঢুকার পর থেকেই দুজন সবসময় একসাথে থাকতাম, সেও প্রচ্ছন্নভাবে আমাকেই ফলো করতো। আমি কখনো সামনের বেঞ্চে বা কখনো পিছনের বেঞ্চে বসলেও সবসময় সে আমার আশে পাশেই থাকতো। তাই আস্তে আস্তে দুজনের ভাবের যেন মিলজুল হয়ে গেল সহজেই। আমি বললাম-
-ধুর বেটা, এভাবে থাকা যায় না কি কথা বার্তা না বলে ?
– তো, ওরা কথা না বললে কী করবি, লিপি মেয়েটার সাথে গতকাল আগে আসার সুবাদে একটু কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম, ও বলল ওকে থ্রেট দেওয়া হয়েছে কথা না বলার জন্য। ঐ গ্রুপটা বাকী মেয়েদেরকে কেমন চোখ রাঙানি দেয় তুই দেখেছিস?
-শুন, এটাই তো আমাদের জন্য সুযোগ।
-মানে
-মানে লিপি আর তিতাস ঐ দুটাকে ওদের ভয়কে জয় করিয়ে আমাদের দলে ভিড়াতে হবে।
– ওরে বাপরে, আমার দ্বারা হবে না।
-তোকে কিছু করতে হবে না, তুই শালা আমার সাথে আছস কিনা বল…
এরকম একটা শীতল সময়েই টিচার ঘোষণা দিলেন সব ছাত্র ছাত্রীকে চারজন করে করে টীম গঠন করে নিতে হবে। মাঠে প্র্যাকটিকেল ওয়ার্ক, সেম্পল কালেকশন এসব কাজে প্রত্যেক টীমের বানাতে হবে আলাদা আলাদা প্রেজেনটেশন। ব্যস আর যায় কোথায়। মিঝু’র সাথে আমার ঠিকই করা ছিল, আমাদের দলে তিতাস আর লিপি ঐ দু’টোকেই নিয়ে নিলাম। দুজনই খুবই পজেটিভ মানসিকতার, তাই সহজেই তাদের সাথে আমার আর মিঝু’র বন্ধত্ব হয়ে গেল। যা দেখে অন্যরা আরো বেশী জ¦লতে শুরু করেছিল ঈর্শায়। কিন্তু সেই টীম ওয়ার্ক জমে উঠার আগেই একদিন লিপি এসে বলল-
-সোহেল আমি ডিপার্টমেট চেঞ্জ করে ফেলেছি, আমি বাংলা বিভাগে এডমিশন ট্রান্সফার করেছি
এমনিতেই ও চোখে মোটা লেন্সের চশমা পরে থাকতো, তাকে ডাক্তার নাকি বলে দিয়েছে চোখে প্রেসার না ফেলার জন্য তাকে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ ছাড়তে হবে, সে নাকি মাইক্রোস্কোপে কিছু দেখতে পারবে না। অগত্যা আমাদের টীমটা খোড়া হয়েই রইল, তিতাসকে নিয়ে আমি আর মিঝু আমাদের তিনজনের টীম হয়ে গেল। উদ্ভিদবিদ্যার প্রয়োজন অনুসারে আমাদের বানাতে হতো বিভিন্ন লতা, গুল্ম ও ফুলের হার্বেরিয়াম সিট। সংগ্রহ করতে হতো ছত্রাক, শৈবালের নানান রকম স্পেসিমেন যেটা ব্যবহারিক পরীক্ষার অংশ। যার কারণে আমরা টীমের তিন জনই বেরিয়ে পড়তাম শহর গ্রামের বিভিন্ন জায়গায়, স্পেসিমেন সংগ্রহও হত আর সাথে বেড়ানোও হত, হতো ফটোসেশনও। এভাবে তিনজন এতটাই অন্তরঙ্গ এবং একাত্ম হয়ে গেলাম যেন বিচ্ছিন্ন হবার নয়। কিন্তু বিধি বাম, ধীরে ধীরে আমাদের অন্তরের রাজ্যটা ’ট্রয়’ হতে শুরু করল। মনে হল আবেগের কোণটাতে ভালোবাসার স্ফটিক জমা হতে শুরু করেছে। যার ফলে আমার সেই মেয়ে টীমমেট আমার দৃষ্টিতে ’হেলেন’ হতে শুরু করল। কিন্তু না বিবেক যেন আমাকে খুবই কড়া করে শাসন শুরু করে দিল, কারণ আমরা নিজেরাই আমাদের টীমের নাম দিয়েছিলাম ‘বন্ধন- যেখানে বন্ধুত্ব’। তাই বিবেকটা বারবার বলে দিচ্ছিল-
‘খবরদার, এখানে বন্ধুত্ব শুধু’ এর বেশি কিছু চেয়ো না যেন। তাহলে সম্পর্ক কুলষিত হওয়ার আশঙ্কা হবে।
এসব ভেবে ভেবে আমি নিজের মধ্যে নিজেই যেন চুপসে গেলাম। কিন্তু অন্তরের মাঠে বীজপত্র মেলে বেরিয়ে আসা আমার ভালোবাসার বিটপগুলো দক্ষিণা হাওয়ায় বড়ই উম্মাতাল হয়ে দুলতে লাগলো। নিজের আবেগকে সামাল দিতে গিয়ে আমি ক্লাসে অনিয়মিত হতে শুরু করলাম। এটা করতে গিয়ে আমার মাথায় একবারও আসেনি যে আমার অনুপস্থিতিতে বাকী দুজনের অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকবে। ঠিক যা ভেবেছিলাম তাই, যেখানে বাঘের ভয় ছিল সেখানেই যেন রাত হয়ে গেল। ‘তিতাস’ নামে একটা ‘পদ্ম’ কে আহরণ করার জন্য আমরা দুই বন্ধু নীরবে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বিতে রূপান্তরিত হয়ে গেলাম। যদিও আমি আমাদের বন্ধনের মূলনীতিতে আমি অটুট কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি মিঝু যেন আরো একটু আগ বাড়িয়ে যাচ্ছে। আমার বিশ্বাস ছিল তিতাস হয়তো অনন্যোপায় হয়ে এক জনের অনুপস্থিতির কারণে অন্যজনকে কিছু বলতে পারছেনা। তাই একদিন ক্লাস শেষে নিজের শংকা তিতাসের সাথে শেয়ার করতে চাইলাম-
-তিতাস তুমি কি কোনো কারণে ডিস্টার্ব ফিল করছ ?
-কই, কেন বলোতো ?
– দেখ তিতাস, আমরা আমাদের গ্রুপের নাম দিয়েছিলাম ‘বন্ধন- যেখানে বন্ধুত্ব…
-ও বুঝতে পেরেছি। কেন বন্ধুতের চেয়ে বেশী কিছু যদি কেউ চায় এখানে অপরাধের কি কিছু আছে ?
ব্যাস, বুঝনেওয়ালার জন্য এটুকু ঈশারাই যথেষ্ট। আমার সমস্ত পৃথিবী যেন একবার ডিগবাজি খেয়ে উল্টেগেল আমার সামনে। তিতাসের মুখ থেকে এমন একটা কথা শোনার জন্য আমিতো মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম তিনজনই। উথাল পাতাল বাতাসে ইউকেলিপ্টাসের ডগাগুলো অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। তুমুল বৃষ্টির ঝাপটায় অনেকগুলো লম্বা লম্বা পাতা আকাশ থেকে খসে পড়ার মতো আমার পায়ের কাছে যেন লুুটিয়ে পড়ল। তার সাথে তীব্র বাতাসে বৃষ্টির একটা ঝাপটাও আমার উপর আছড়ে পড়ল, খেয়াল করিনি বাতাসে ছিটকানো বৃষ্টির ঝাচে ওরা দুজন সরে গেছে কখন আমার পাশ থেকে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে মুষলধারায় ঝরে পড়া বৃষ্টি কণা দেখে দেখে অন্তরের ভালোবাসার কাব্যকণা গুলো নাড়াচাড়া করতাম ভাবাবেগে। আজ সেরকম একটা বর্ষণমুখর বাদলা দিনে আমার অন্তরটা না পাওয়ার বেদনা ভরা ক্রোধের আগুনে দাউ দাউ করে জ¦লতে শুরু করে দিল। তিতাসের কথার উত্তর দেওয়াতো দূরে থাক আমি আর মিঝু’র দিকেও তাকাতে পারিনি। তুমুল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হাঁটা শুরু করেদিলাম ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যেতে। পিছন থেকে তিতাসের গোটা দুয়েক ডাক শুনতে পেলাম-
-সোহেল, শোন সোহেল…
কিন্তু হেলেনের জন্য সাজানো আমার অন্তরের ‘ট্রয়’ নগরী ততক্ষণে দাউ দাউ করে জ¦লতে শুরু করেছে। এত তুমুল বৃষ্টি সেই লেলিহানের ছিটেফোটাও যেন নিভাতে পারছে না। সমস্ত শরীর ভিজে কাপড় লেপ্টে যাওয়া দেহে আমার পথচলা কিছুতেই যেন থামবার নয়। জানি না কোথায় যাচ্ছি, সবাই ভাবছে হয়তো ছেলেটা পাগল হয়ে গেল নাকি! এই তুমুল বৃষ্টিতে এমন উদভ্রান্তের মত হাঁটছে কেন? কিন্ত ওরা কেউতো জানেনা শ্রাবণের এই ধারায় এমন উদভ্রান্ত হয়েও আমার অন্তর জ্বালার আগুন যে আমি নিভাতে পারছি না। জ্বলে জ্বলে আপাদমস্তক একাকার। অন্তরে শুধু ‘তিতাস’ এর ভাবনা- আমার ভালোবাসার মথিত হওয়া অঙ্কুর যেন এ জলে জ্বলে ওঠে আরো দ্বিগুণ তাপে। কেউ না জানুক, জানে সেই বরিষণ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


License Activation Required: for shailitv License is not activated. Please activate the License.