মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৩১ অপরাহ্ন
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে এদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। শহীদদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা আমাদের প্রিয় এই জন্মভূমি পেয়েছি।মুক্তিযুদ্ধের কথা ভাবতে গেলেই প্রথমে চোখে ভাসে এ দেশের দামাল ছেলেদের কথা।যাঁরা জন্মভূমি আর দেশ মাতৃকাকে ভালবেসে অস্ত্র হাতে নিয়েছিল।শুধু দামাল ছেলে নয়,এ দেশের শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি, আপামর জনতা দেশকে স্বাধীন করার জন্য অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। তেমনি অসংখ্য মা, বোনদের ও নিজেদের জীবন ও সম্ভ্রম হারাতে হয়েছিল।এ দেশের সাহসী নারীরা যুদ্ধকালে তথ্য, অস্ত্র, খাদ্য,সেবাসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে যুদ্ধকে বিজয়ের পথে এগিয়ে নিতে কাজ করে গেছেন,এমনকি আমাদের সাহসী মেয়েরাও অস্ত্র হাতে লড়াই করেছিলেন সেদিন দেশমাতৃকার জন্য। এমনি একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক তারামন বিবি।একাত্তরে অস্ত্র হাতে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে যিনি বিন্দু মাত্র পিছ পা হননি। অত্যন্ত সাহসী এই নারী কুড়িগ্রাম জেলার শঙ্কর মাধবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অতি সাধারণ একটি পরিবারে। তাঁর বাবার নাম ছিল আবদুস সোবহান আর মায়ের নাম কুলসুম বেওয়া। নিজ গ্রামেই বেড়ে ওঠা তারামন মাত্র ১৪ বছর বয়সে যুদ্ধে অংশ নেন ১১ নং সেক্টরের অধীনে। কুড়িগ্রাম ও এর আশপাশের এলাকা ছিল এই সেক্টরের অধীনে। প্রথম থেকেই তারামনের কিশোরীমনে প্রবল আগ্রহ ছিল কেবলমাত্র পরোক্ষ নয়,অস্ত্র হাতে প্রত্যক্ষভাবে ও যুদ্ধ করার।যুদ্ধের পুরো নয় মাস ধরেই তিনি কখনো প্রত্যক্ষ,কখনো পরোক্ষভাবে যুদ্ধে অংশ নেন। একদিন মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ক্যাম্পে অবস্থানকালে দুপুরের খাবারের সময় তাঁরা জানতে পারেন, এক গানবোটভর্তি পাকিস্তানি সেনা তাঁদের ক্যাম্প আক্রমণ করতে আসছে।খাবার রেখে তাঁরা তখনই যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন।প্রথমবার সেই সম্মুখযুদ্ধে তারামন বিবি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে শত্রুর মোকাবেলা করেন।তাঁর এবং অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণে একদিকে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়,অন্যদিকে পুরুষ যোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই নারীযোদ্ধার সশস্ত্র সংগ্রাম করার যোগ্যতা ও প্রমানিত হয় সহযোদ্ধাদের কাছে। এরপর থেকেই তিনি নিয়মিত বিভিন্ন সম্মুখসমরে অংশগ্রহন করতে থাকেন।এসব যুদ্ধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১১ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভূক্ত গাইবান্ধার সওঘাটা ও ফুলছড়ি এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ওই এলাকার কোদালকাঠির আকস্মিক যুদ্ধে তারামন বিবির অর্জন পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।আবার এই নারীর যুদ্ধ কিন্তু শুধু অস্ত্র ধারনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলনা।মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারের ব্যবস্হা করা ছাড়া ও তিনি প্রয়োজনীয় অনেক তথ্য জোগাড়ে ও অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দেন।প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে তারামন ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়ে শত্রু শিবিরের অবস্থান আর গোপন পরিকল্পনা, সেখানকার লোকবল,মজুদকৃত অস্ত্রের বর্ণনা জানতে পাগলের বেশে গেছেন পাকিস্তানি বাহিনীর ঘাঁটিতে।কখনো সারা শরীরে কাদামাটি, কালি,ময়লা আবর্জনা, এমন কি মানুষের বিষ্ঠা পর্যন্ত গায়ে লাগিয়েপাগল সেজেছেন এই সাহসী নারীযোদ্ধা তারামন বিবি।আবার কখনো মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী,অন্ধ,বোবা সেজে পাকিস্তানি সেনাদের সামনে দীর্ঘ হাসি কিংবা কান্নার অভিনয় করে শত্রুসেনাদের খোঁজ নিয়ে এসেছেন। যুদ্ধের প্রয়োজনে কখনে সাঁতরে পার হয়েছেন নদী।আবার কখনে কলাগাছের ভেলা নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন নদী। এভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর শ্রম,আন্তরিকতা, ত্যাগ এ দেশের বিজয় অর্জনে এক মহান অবদান রেখেছিল। যিনি শুধু মাটির টানে,দেশকে ভালবেসে দেশের জন্য নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে গেছেন। বিজয়ের এই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই বীরযোদ্ধা নারীর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক : শিক্ষক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক