বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫২ অপরাহ্ন
১.
পাহাড়ের কোল ঘেষে একটা ছোটখাটো জঙ্গল। সেখানে মানুষজন কেউ খুব একটা যায় না। এই জঙ্গলের মাঝখানে একটি বড় তাল গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
সে তাল গাছের পাতার ডালে অসংখ্য বাবুই পাখির বাসা ঝুলে আছে। এটা বাবুই সমাজের রাজ্য। ওদের রাজ্যে প্রধানের নাম হলো টোনা। টোনার রানীর নাম হলো টুনী।
টোনা শাসক হিসাবে খুব ভালো নয়। সে বদরাগী, অহংকারী, লুটেরা স্বভাবের। টোনা রাজা কোন কাজকর্ম করে না। অন্যান্য বাবুই পাখিরা খাদ্য সংগ্রহ করে টোনা রাজার দরবারে পাঠাতে হয়। যদি কোন বাবুই পাখি ঠিক ভাবে খাদ্য সরবরাহ না করে, তাহলে তার উপর নেমে আসে ভয়াবহ অত্যাচার। তার ঘর বাড়ী লুটপাট করা হতো। ঘরে ডিম থাকলে তা ভেঙে ফেলা হতো। ছোট বাচ্চা থাকলে তাকে মেরে ফেলা হয়। কেউ যদি প্রতিবাদ করে তাকে সমাজচ্যুত করে তাল রাজ্য থেকে বের তরে দেয়া হয়। টোনা রাজার অত্যাচারে এখানকার সকল বাবুই পাখিরা একেবারে অতিষ্ঠ।
২.
তাল গাছের গোড়াতে রয়েছে অসংখ্য মাটির ঢিবি। ছোট বড় মিলিয়ে অনেকগুলো ঢিবি।এই ঢিবিগুলো হলো পিঁপড়া রাজ্য । সকল পিঁপড়ারা এখানে দলবদ্ধ ভাবে বসবাস করে। পিঁপড়াদের রানীর নাম মায়াবতী। সে খুবই মানবিক, দয়ালু, পরোপকারী। পিঁপড়াদের রানী মায়াবতী তাল তলায় বসবাসকারী সকল পিঁপড়াদের খুবই প্রিয়। সবাই তাকে জীবন দিয়ে ভালোবাসে। রানী মায়াবতীও তার রাজ্যের সকল পিঁপড়াদের প্রাণপণ ভালোবাসে। সবার ঘরে খাবার আছে কিনা নিত্য খোঁজখবর নেয়। যদি কেউ খাবার সংগ্রহ করতে না পারে,তাহলে তাকে রাজকোষ থেকে অনুদান দেয়া হয়। তার মেহমানখানায় প্রতিদিন হাজার হাজার মেহমান তিনবেলা খেয়ে যায়।
পিঁপড়ারা খুবই ভদ্র,বিনয়ী এবং সুশৃঙ্খল প্রাণি। ওদের জীবন যাপন খুবই সাধারণ এবং একতাবদ্ধ। এই কারণে ওরা খুবই সুখী।
৩.
এভাবেই কেটে যাচ্ছিল সময়। বাবুই পাখিরা তাদের জীবন যাপন নিয়ে ব্যাস্ত সময় কাটাতে লাগলো। তারা উড়ে উড়ে দূর গ্রামে চলে যেতো। সেখান থেকে খাবার সংগ্রহ করে নিজেদের জীবন বাঁচাতো। আর এদিকে টোনা টুনি মনের সুখে অন্য বাবুইদের শ্রমে ঘামে সংগ্রহ করা খাবার খেয়ে বেশ আরামে দিন কাটাতে লাগলো। টোনা রাজার শক্তিশালী একটা পেটুয়া বাহিনী ছিল। তারা তাল গাছের পাতার আনাচে কানাচে সবসময় হম্বিতম্বি করে ঘুরে বেড়াত। বিভিন্ন ধরনের অন্যায় অবিচারে তারা জড়িয়ে পড়েছিল।
এই বাবুই রাজ্যে সবসময় ভয়, আতংক আর অশান্তি বিরাজ করতো। বয়স্ক বাবুই পাখিরা ঘরে বসে থাকতো। মানে যারা ঠিক মত চলা ফেরা করতে পারে না। ডানায় ব্যাথা,পায়ের হাঁটুতে ব্যাথা, চোখে কম দেখে, তারা কোথাও যেত না। নাতি নাতিদের দেখা শুনা করতো। গল্প শোনাত। বৃদ্ধদের সন্তানরা বাহির থেকে সারাদিন পরিশ্রম করে খাবার সংগ্রহ করতে পারলে তখন তাদের খাবার জুটতো।
অনেক সময় তাও পারা যেত না, টোনা রাজার পেটুয়া বাহিনী সেসব খাবার কেড়ে নিয়ে খেয়ে ফেলতো। তখন বৃদ্ধ মা বাবারা না খেয়ে উপোস থাকতো।এইসব পেটুয়া বাহিনী চাঁদা আদায়ের নামে যার ঘরে যা পেত সব লুটপাট করে নিত। ওরা ছিল ভয়ংকর চাঁদাবাজ।
এইসব দু:খে বৃদ্ধ বৃদ্ধরা চোখের পানি ফেলত আর আল্লাহ্ দরবারে ফরিয়াদ জানাতো।
৪.
পিঁপড়ারা ছিল বংশ পরম্পরায় দূরদৃষ্টি সম্পন্ন প্রানী। ওরা কঠোর পরিশ্রম করে প্রতিদিনের খাবার মিটিয়ে আপদকালীন সময় বর্ষা, বন্যা, ঝড়, তুফান, খরার জন্য খাবার সংগ্রহ করে তাদের রাজ্যের গোলায় তুলে রাখত।কারন, এসব দূুর্যোগকালে তারা ঘর থেকে বের হতে পারে না। পিঁপড়া একটা অতি ক্ষুদ্র প্রাণী হলেও ওরা কিন্তু একতা,শৃঙ্খলা,জীবন যাপনের ব্যাপারে খুবই ধৈর্যশীল।
৫.
পিঁপড়ারে সুন্দর সাজানো গোছানো জীবন দেখে টোনা রাজার হিংসা হতে লাগল। তাদের খাবারের গোলার উপর টোনার লোলুপ দৃষ্টি পড়লো। লোভে সে নিষ্ঠুর হয়ে উঠলো।
সে তার পেটুয়া বাহিনী দিয়ে পিঁপড়া রাজ্যের গোলার সব খাবার লুট করল। তাদর প্রচুর ঘরবাড়ী নষ্ট করল। অনেক নিরীহ পিঁপড়া মারা গেল। এতে তারা অনেক কষ্ট পেল। কিন্তু কোন প্রতিশোধ নিল না। তারা ভেঙ্গে পড়লো না। তাদের রানী মায়াবতীর নির্দেশ এবং নেতৃত্বে পিঁপড়ারা আবার সব কিছু নতুন ভাবে গড়ে নিল। স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে লাগলো।
৬.
বৈশাখ মাস। হঠাৎ আকাশ অন্ধকার হলো। বাতাস প্রচন্ড গতিতে বইয়ে শুরু করলো। উথাল পাতাল বৃষ্টি শুরু হলো। শুরু হয়ে গেল মারাত্মক কাল বৈশাখী।
পিঁপড়ারা তাদের যার যার ঘরে নিরাপদে ঘুমাতে লাগল। তাল গাছের মাথায় প্রচন্ড ঝড় বাতাসের দাপটে বাবুই পাখিরা আর টিকতে পারলো না। যে যেদিকে পারলো উড়ে চলে গেল।
শুধু টোনা রাজা যেতে পারলো না। সে উড়তে গিয়ে তাল গাছের ডালের সাথে ধাক্কা লেগে তার একটা পাখা ভেঙ্গে গেল। আর উড়তে পারলো না। নীচে পড়ে গেল। সে পিঁপড়াদের ঢিবির কাছে মরার মত পড়ে থাকলো। টোনার এই অবস্হা দেখে টুনী নিজের জীবন বাঁচাতে দূরে কোথাও উড়ে চলে গেল।
৭.
কাল বৈশাখী ঝড় থেমে গেল। চারিদিকে সব শান্ত পরিবেশ। লন্ডভন্ড প্রকৃতি। পিঁপড়ারা সবাই আস্তে আস্তে
ঘর থেকে বেরিয়ে আসল। টোনা রাজার এই অবস্হা দেখে সবাই হতবাক হয়ে গেল। তার জন্য পিঁপড়াদের খুব মায়া হলো। রানী মায়াবতী নির্দেশে টোনা রাজাকে ওদের রাজ্যের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।
রাজ্যোর সকল হেকিম – কবিরাজ এসে চিকিৎসা করতে লাগল। টোনা রাজাকে পিঁপড়াদের গোলার মজুদ খাদ্য থেকে প্রচুর খাবার খাওয়ানো হলো। রানী মায়াবতী নিজেই সব তদারকী করল। একদিন টোনা রাজা সম্পূর্ণ সুস্হ হলো।
তারপর বিদায়ের সময় সকল পিঁপাড়াদের উদ্দেশ্য টোনা রাজা ছল ছল চোখে বলল,” আমি আজ শিখলাম, ভালোবাসা কী? মানবতা কী?”
এই বলে টোনা রাজা গভীর জঙ্গলের দিকে উড়ে উড়ে চলে গেল।