শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১১:৫১ অপরাহ্ন

যমুনা পাড়ের ছেলেটি / পূর্বা চৌধুরী

হু হু করে বাতাস বইছে, আর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে।সকাল থেকেই মেঘ গুমড়োমুখো কাল হয়ে আছে তাই বুঝি এত বৃষ্টি হচ্ছে! প্রকৃতির বৃষ্টি দেখা যায় আর মনের বৃষ্টি, মনের কান্না কে দেখে! বিধাতা ছাড়া? এসব ভাবতে,ভাবতে জানালার বাইরে চোখ পড়তেই দেখি দৌড়ে কে যেন আসছে বড় কলাপাতা মাথায় দিয়ে, ডাক শুনলাম, ভিতর থেকে, “দিদি কোথায় তুই”? আমি কি আজ স্কুলে যাব না,ভাত দিবি না? ডাক শুনে বের হয়ে দেখি নীরু এসেছে। কি বলিস ভাই, এত বৃষ্টি সকাল থেকেই বড় মাঠ,রাস্তা ঘাট সবই যে পানিতে ডুবে যাচ্ছে। তাই আজ আর স্কুলে যেতে হবেনা।কিন্তু দিদি,আমার যে খুব ক্ষিধা পেয়েছে,ঠিক আছে ভাই,খেতে দিচ্ছি। এরপরই পাশের বাড়ীর পিন্টু এসে বলল,কি রে নীরুআজ স্কুলে যাবি না? যেতে তো চাইলাম,কিন্তু বৃষ্টি বলেই দিদি নিষেধ করছে,তাই আজ যাব না।একটু পর দিদি গরম ভাত আর গুড় নিয়ে আসল।দিদি,আজ তরকারি রান্না হয়নি? না, ভাই। আজ গরম ভাত গুড় দিয়ে খেয়ে নে।আমি খেতে বসলে, দিদি আমার পাশে বসে থাকে আর খেতে, খেতে দিদিকে বললাম, দিদি ” আজ একটু নদীতে মাছ ধরতে যাই? পিন্টু ও যাবে বলেছিল। বৃষ্টিতে খলসে মাছ অনেক ধরা যায়। দুপুরের আগেই ফিরে আসব।দিদি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। খাওয়া শেষ হলেই দিদি থালা নিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে যায়। আমি বর্শি আর ছোট একটা ডেকচি নিয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে পিন্টু কে ও ডেকে নিয়ে নদীর দিকে রওনা দিলাম। আজ নদীতে অনেক স্রোত।দু’জনেই নদীতে বর্শি ফেললাম,কিছুক্ষণ পরই আমার বর্শিতে মাছ ধরা পড়েছে। এক,দুই, তিন এভাবে আরো কিছুক্ষণ পরে আরো অনেকগুলো খলসে,বাতাসি মাছ ও পেয়ে গেলাম।বন্ধু পিন্টু ও বেশ কিছু মাছ পেয়ে গেলে দুজনেই খুশী মনে বাড়ী ফিরে আসলাম। দিদিকে ডেকে বললাম, দিদি আজ অনেকগুলে মাছ পেয়েছি,মাছ দিয়ে ভাত খাব।রান্না করবি না? হ্যাঁ ভাই, তুই সান টা করে আই,আমি রান্না করে দিচ্ছি। ওর বেরিয়ে যাওয়া দেখতে,দেখতে ভাবছি,দেখতে,দেখতে ভাইটা আমার অনেক বড় হয়ে গেছে।ওর বয়স যখন আড়াই বছর,তখন মা মারা যান।আমিও তখন অনেক ছোট ছিলাম। আমাদের বিরাট এক বাড়ী ছিল এই মেছড়াতেই। আম,জাম,কাঁঠাল, লিচুর বাগান, আমের অনেক জাতের গাছ ছিল।কোনটা আষাঢ়ে আম,কোনটা কাঁচামিঠা আম,কোনটা আবার ল্যংড়া জাতের আম,আর ছিল বিশাল আখ ক্ষেত।সেই আখের রস জাল করে গুঁড় তৈরী করা হত।যখন ঊনুনে দিয়ে জাল করা হত,তখন সারাবাড়ি সেই গুঁড়ের ঘ্রাণে মৌ,মৌ করত সারাবাড়ি।মনে আছে খুব, মায়ের একবার খুব জ্বর হল,সে জ্বরেই হঠাৎ মা মারা যান।তখন থেকেই তখন থেকেই ভাইকে কোলে পিঠে করে বড় করেছি আমার উপর পড়ল। আষাঢ় মাসের এক ঘন ঘোর বর্ষার দিনে, আমি কয়েকদিন ধরেই বিছানায়। নীরু সকালে দৌড়ে আমার কাছে এল,” ও দিদি,রান্না করবিনা”? দিদি,ও দিদি বলে জোরে ডাকতেই একটু জোর করে চোখ খুলে তাকালাম।দেখলাম, ভাইটি আমার কপালে হাত রেখে বলল,দিদি,তোর তো অনেক জ্বর,আমায় ডাকলি না কেন! আমি ও গ্রামের কবিরাজ দাদুর কাছ থেকে ওষুধ এনে দিতাম। হ্যাঁরে ভাই,অনেক খারাপ লাগছে। একটুপর কপালে একটু ঠান্ডা আর আরাম লাগছে।ছোট ভাইটি আমার কপালে জলপট্টি দিচ্ছে। এরপর শুনলাম,ছোট খুড়ীমার গলা।যারে নীরু পাশের গ্রমের কবিরাজ দাদার কাছ খেকে দাওয়ায় এনে দে।তোর দিদির তো আজ কয়েকদিন ধরেই জ্বর কমছেনা।
আমি দৌড়ে বের হলাম ঘর থেকে। কিন্তু নদীর ঘাটে এসে দেখি কোন নৌকায় ঘাটে নেই। এই নদী টা পার হলেই পাশের গ্রামের কবিরাজ দাদুর বাড়ী থেকে দিদির জন্য জ্বরের ঔষধ আনতে হবে। ঘাটে এসে উচ্চস্বরে ডাকলাম,হারান কাকা,হারানকাকা..!! তুমি কোথায়! আমায় একটু পার করে দাওনা,ওপারের গ্রামের কবিরাজ দাদুর কাছে যেতে হবে আমায়। বাতাসের বেগে,শব্দ জোরে পৌঁছাতেই কিছু দূরে দোকান ঘরের চালায় বসে থাকা হারান কাকা দৌড়ে এসে বললেন,তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে নীরু?এমন ঝড় বৃষ্টিতে নৌকা চালানো সহজ নয়।তুই বরং অপেক্ষা কর।না,কাকা,আমি তোমার অনেক পয়সা দেব,আমায় পার করে দাও। আমার কথা শুনে একটু পরেই মাঝি নৌকা ছাড়লেন।সাথে ও গ্রামের আরো কয়েকজনকে পেয়ে গেলাম। নৌকায় বসে খুব ভয় করতে লাগল।এমন ঢেউ যমুনা নদীতে আগে কখনো দেখিনি।ঝড় বাতাসে যেন আচঁড়ে পড়ছে নৌকা। সবাই আল্লাহ, আল্লাহ বলে ডাকতে লাগল আর আমার মনে পরে গেল,দিদি বলতেন,ভয় পেলে হরিকে ডাকতে হয়।আমিও হরি, হরি বলে ডাকতে লাগলাম।এক সময় নৌকা কুলে পৌছাল। আমি দৌড়াতে,দৌড়াতে বাজারের পাশে কবিরাজ দাদুর বাড়ীতে পৌঁছেয় ডাকতে লাগলাম, কবিরাজ কাকু,কবিরাজ কাকু,দরজাটা খোলেন।আমার চিৎকার শুনে দরজা খুলে বের হলেন কবিরাজ কাকু, কীরে নীরু! এমন ঝড় বৃষ্টিতে তুই কিভাবে এলি? কাকা, দিদির খুব জ্বর আজ কয়েকদিন ধরেই,তাই ওষুধ নিতে এসেছি। আমার কথা শুনে কাকা ভিতরে গিয়ে ওষুধের দুইটা শিশির এনে আমার হাতে দিয়ে বললেন, এই নে।দুই টা শিশির থেকেই দুইবেলা দুই চামচ করে ওষুধ খাওয়াতে হবে। পয়সা এনেছিস? হ্যাঁ কাকা, বলে পয়সা ভর্তি থলে টা তাঁর হাতে এগিয়ে দিয়ে আমি বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে।তখনো ঝড়ের দাপট তেমন কমেনি,বৃষ্টি ও হচ্ছে। আমি যখন ঘাটে পৌছলাম, তখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, সন্ধ্যা হতে আর বেশী দেরী নেই। এ অবস্থায় ঘাটে কোন নৌকায় নেই।আমি কি করব বুঝতে পারছিলাম না,আমাকে যে ঔষধ নিয়ে বাড়ী পৌছঁতেই হবে।দিদির খুব অসুখ, চেয়ে আছি নদীর কালো আর ঘোলা জল। এমন পাগলের মত ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হল,কেউ আমায় ডাকছে,নীরু,নীরু এখন নদী খুব উত্তাল। পার হতে পারবিনে বাপ….!!আমার মনের ঢেউ কেউ দেখছেনা!!


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *