বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৬ অপরাহ্ন

জয়তু চেয়ার / ড. আনোয়ারা আলম

চেয়ার বর্তমান যুগের এক অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। আমাদের ছোটবেলায় আমরা কিন্তু সহজে চেয়ার পাইনি। লেখাপড়া বা খাওয়া দাওয়া সব মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে। অতিথি আপ্যায়নে নকশা করা চাদরের ব্যবহার। ধীরে ধীরে এলো চারপায়া কাঠের চেয়ার।
চারপায়া কাঠের চেয়ারের কতো কতো ইতিহাস। কতো বিচিত্র তথ্য। চেয়ার শব্দ কিন্তু বাংলা না। প্রাচীন ফরাসী থেকে আমদানি করা শব্দ।
চেয়ার ব্যবহারের গোড়ার ইতিহাস মিশরে। রোমান চেয়ারগুলো ছিল মার্বেলের তৈরি। কাঠের চেয়ার এলো ষষ্ঠ শতকে এবং গ্রীসে এর ব্যবহার ছিল। তবে প্রাচীন বা মধ্যযুগে চেয়ার কিন্তু সাধারণ জনগণের জন্য না। চেয়ার নেতৃত্ব ও আভিজাত্যের প্রতীক। যেমন একটা সময় রাজসভায় বা জমিদারদের বা সামাজিকভাবে আভিজাত্যপূর্ণ পরিবারের। জমিদার আমলে তিনি চেয়ারে আর প্রজারা সব নিচে। তো মহারানি ভিক্টোরিয়ার আমলে এক কর্মচারীকে শাস্তিস্বরূপ ২৮ ঘণ্টা মেঝেতে বসে থাকার পরে ঐ ব্যক্তিকে টেনে তুলতে তিনজন লোকের দরকার হয়েছিল।
চেয়ার! শুধু বসার জন্য নয়। এর সাথে ক্ষমতার উত্তরণ ও জড়িত। যতো ক্ষমতাবান ততোই চেয়ারের ডিজাইন বা ধরন পাল্টে যাওয়া। কাঠ থেকে কুশন বা গদীর সব বিচিত্র ব্যবহার।
বিভিন্ন অফিসে চেয়ারের পেছনে তোয়ালের ব্যবহার। এরও একটা ইতিহাস আছে। ব্রিটিশ আমলে অফিসের উপমহাদেশীয় কর্মকর্তারা আসতেন গরমে ঘেমে নেয়ে আবার মাথার চুল ও থাকতো তেল চুপেচুপে। ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের জন্য তো হাতে টানা পাখা ছিল। তো তেনারা ভাবলেন নেটিভদের ঘামেতে চেয়ারের অবস্থা ছ্যাড়াব্যাড়া। দিব্যি ওনারা ঘাম মুছছেন চেয়ারে। সুতরাং শুরু হলো তোয়ালে সংস্কৃতি। ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল এবং পূর্ববাংলায়। স্বাধীন বাংলাদেশেও এ সংস্কৃতি বহাল থাকলো, এক সাবেক সচিবের মতে এটির নানা ব্যবহার এখন ক্ষমতার প্রতীক। যে যতো উপরে তোয়ালেও তত দামি। ‘যেন তোয়ালে মানে গোঁফ দিয়ে যায় চেনা’।
চেয়ারে বসলে আচরণ ও বদলে যায়। মানে ‘আমি একটা কিছু’। যদিও উন্নত দেশগুলোতে অনেক বড়ো মাপের লোকেরাও সহজে চেয়ারে বসেন না।
আবার অবস্থান ভেদে চেয়ারের ধরন পাল্টে যায়। কোনো অনুষ্ঠান বা সভায়। মঞ্চে সাজানো চেয়ার বলে দেবে কে কোন আসনে। সভাপতি বা প্রধান অতিথি বা বিশেষ বা আলোচক। অনেক চেয়ারতো সিংহাসনের মতো। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দর্শকদের জন্য প্লাস্টিকের চেয়ার। আহা! আমরা কি উপলব্ধি করি মঞ্চে বসা অনেকের চাইতে গুণীজন দর্শক সারিতে। কী এক বৈষম্য!
তা চেয়ারের ব্যবহারও নানাভাবে। কোনো অনুষ্ঠানে বা সভায়! বক্তাদের বক্তব্যে যদি এদিক ওদিক! তাহলে চেয়ার অভাগার অবস্থা বেহাল। মারো চেয়ার। সাথে সাথে ভাইরাল রোগের মতো বাতাসে উড়তে থাকে চেয়ার। কারো মাথা ফাটে বা শরীরের এদিকে ওদিকে আঘাত এবং অনুষ্ঠান বা সভা লণ্ডভণ্ড। এই চারপায়া নিরীহ চেহারার চেয়ারের কী ক্ষমতা তখন! ইদানীং খবরে আসে খেলার আসরে বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আলোচনা সভায় দ্বিমত হলেই চেয়ার ছোড়াছুড়ি। প্রবাসে থাকাকালীন এক সভায় চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের মধ্যে যখন চেয়ার মারামারি তখনও দেশের লোকজনের বিদ্রুপ আর হাসাহাসি! ‘ও আল্লাহে হারাম হারাম! তোমরা না-কি উচ্চ শিক্ষিত। তা ইগোর কাছে শিক্ষা আর দীক্ষা কী। পাকিস্তান আমলে এক রাজনৈতিক অধিবেশনে চেয়ারের আঘাতে স্পীকারের মৃত্যু। পুরো রাজনৈতিক চেহারার ভোলই পাল্টে গেল।
স্কুলে যখন তখন শিক্ষক মহাশয় চেয়ারে। পড়া না পারলে বা দুষ্টুমীতে চেয়ারে বসা শিক্ষকের হাতে কান মলা, হাতে কাঠ পেন্সিলের ডলা বা বেতের বাড়ি। ভাবতাম চেয়ারের কী ক্ষমতা। কিন্তু তখন কি আর বুঝেছি এই শিক্ষকের প্রাক্তন কোনো শিক্ষার্থী যদি উচ্চ শিক্ষিত আর তিনি অবসারপ্রাপ্ত। ঐ শিক্ষার্থীকে স্যার না ডাকলে মহা অপরাধ। কারণ তিনি তখন চেয়ারে। অতএব!
চেয়ারের ক্ষমতা অসীম। কী যে অসীম তখন বোঝা যায় যখন অন্য অনেকজনের উপরে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সবার সামনে, যখন তাঁর চাইতে কেউ অতি প্রভাবশালীর সাথে ফোনে কথা বলেন, তখন শুধু কয়েক শতবার স্যার সম্বোধনে চেয়ার ছেড়েই উঠে দাঁড়ান কথা বলতে বলতে। বসকে চিঠি লিখতে আমাদের কতোবার যে স্যার সম্বোধন। অথচ কতো উন্নত দেশে বিশেষত আরব দেশে অফিসিয়াল চিঠিতেও নাম সম্বোধনে। যেমন ‘ডিয়ার মি. অমুক—-’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডায়াসে চেয়ার থাকলেও পড়ানোর সময় এর ব্যবহার নিষিদ্ধ। কিন্তু এখানেও কয়জন মানেন। চেয়ারে বসার কী তীব্র আকর্ষণ।
তো! চেয়ার তো রাষ্ট্র ও সমাজে বৈষম্যের প্রতীক। অথচ মানুষ হিসেবে আমরা সবাই সমান। কিন্ত চেয়ারের বিভিন্ন ব্যবহারে বলতে পারি না — ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য’। অতএব বলতে হয় জয়তু চেয়ার।

লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *