শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১০:০০ অপরাহ্ন

অমিয়ের সন্ধানেই আছি আমি / ফাউজুল কবির

আমার ভাবতে ও আশ্চর্য লাগে -ভুল চেতনা ও চেতনার ভ্রান্তিকে সংজ্ঞায়িত করে কবিতায় বিপ্লবযজ্ঞ সাধন করতে চেয়েছিলেন মালার্মে। তবে একথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে – স্বল্পপ্রজ হলেও কবি হিসাবে তিনি স্নাতক ও সার্থক। তিনি বিশ্বাসের সাথে পরামর্শ দিয়েছিলেন : ভাব দিয়ে নয়- শব্দ দিয়ে কবিতা রচনা করতে হবে। তিনি ভুলতে চাইলেন – ভুল করে – শব্দের পরিকল্পিত গুচ্ছময়তাই তো ভাষা। আর ভাষা মানেই মানুষের ভাব ও মন। সাধারণের মনভাষা – ভাবভাষা আর শিল্পিজনের মনভাষা -ভাবভাষা এক নয় : দুস্তর ব্যবধানে বিরাজমান।
যখন সাহিত্য পড়ি আমরা শুধু ভাষা পড়ি না- ভাষার পুত্রকন্যাদের পাঠ করি না। আমরা লেখক-স্রষ্টা সাহিত্যনির্মাতাবিধাতার মন ও মননের জগতকে স্পর্শ করতে চাই। সাহিত্য একই সময়ের সমান্তরালে নির্মাণ ও সৃজনের কাজ। ভাষার ব্যবহার ও ভাষার উপর দখল সকল স্রষ্টার একরকম নয়। মন মনন ও প্রকৌশল ভিন্নতার কারণে একেকজনের শিল্পে বা সাহিত্যে একেকরকম আনন্দবেদনা বোধের পরিচয় পাই। যখন যেভাবে – যত বিচিত্র পথেই রচনা করি না কেন- যত শ্রমসাধ্য সাধনা বা স্নায়ুছেঁড়া আনন্দযন্ত্রণার ভোগে উপভোগে নির্মাণে- সৃজন -দর্শনে-শিল্পে খচিত করি না কেন – মূলভাষ্য হচ্ছে : ভাষা।
মহৎ শিল্প মহৎ সাহিত্য মূলত : ভাষার উপর লেখক শিল্পীর স্বতন্ত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ও স্ব-ক্ষমতার পরিচয় বহন করে। প্রত্যেক লেখাতে ছবিতে আঁকাতে প্রকাশ পায়- মন। আর মন যদি ধরা না পড়ে তবে বলতে হবে তিনি স্রষ্টা নন- নিষ্ফলা জমির চাষা।চাষা ও কৃষকে পার্থক্য আছে জীবন ও শিল্পে। মোটকথা অনুভূতির অনির্বচনীয়তা প্রকাশের ক্ষমতা। সে কারনেই অনেকেই কবি কিন্তু মহৎ কবি অংগুলিমেয়। তা ও আবার মহত কবির সৃষ্টির মহত্ত্বকে ধরতে সময় লেগে যায় অনেক। বিস্ময়করের – স্বভাবই এরকম।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করছি কমল কুমার ও বিনয় মজুমদারের কথা । কমল কুমার মজুমদার কিংবা বিনয় মজুমদারের ভাষাভংগিমা ও মনোজগতের বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও
আমরা শুধু তাদের ভাষায় আবিষ্টনিবিষ্ট থাকি না – তাঁদের শিল্পের মর্ম্মমূলে যখন ঢ়ুকে পড়ি তখনই স্বস্তি পাই- অনবদ্য বিস্ময়কর মনসমূহকে জানা গেলো।
শিল্পী রামকিংকর বলতেন – আমি আমার ছবিতে দৃশ্যকে ধরি আর রবীন্দ্রনাথ অদৃশ্যকে
ধরতেন। মহান শিল্পী ও সাহিত্যিক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখায় বানান ভুল করতেন বেশি। কেউ একজন অনুযোগের স্বরে তাঁকে জানালে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন এরকম : আমি spell করি না- spellbound করি। কথাটার সর্বজনীন গুরুত্ব আছে শিল্প আর সাহিত্যের জগতে।
কবি সুধীন্দ্রনাথের কথাই ধরা যাক। তিনিও স্বল্পপ্রজ কবি। বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা করতেন মালার্মেকে। সুধীন্দ্রনাথের কবিতার সংখ্যা ১৩০। তার মধ্যে ৯০ টি অক্ষরবৃত্তে ৩০ টি মাত্রাবৃত্তে এবং ১০ টি মাত্র স্বরবৃত্তে লেখা। তাঁর প্রবন্ধের ভাষা একান্ত নিজস্ব- সুধীন্দ্রনাথীয়। আশ্চর্য পরিমিত ও নির্বাচিত এবং প্রাজ্ঞতায় অসাধারণ। তিনি সাধারণের ভাষা থেকে আবিষ্কার করেছিলেন সৃজনস্বকীয়তায় নিজস্ব ভাষা ও অতুলনীয় প্রকাশভংগি। শব্দ সম্পর্কে অতিসচেতন এই কবিকে ও জীবনের প্রান্তে শেষ সিদ্ধান্তে এসে বলতে হয়েছে : ‘ সুদীর্ঘ জীবনের সমস্তটা তাৎপর্য ও মাধুর্যের ধ্যানে কাটলে তবে হয়তো অন্তিমে দশটা সার্থক পদ কলমের মুখে জোটে। ‘
প্রতিভা মানে অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ক্ষমতা। একে অস্বীকার করবার প্রয়োজন নেই। তবে একথা ও মানতে হবে : প্রতিভা – মেধা – প্রেরণা – ধ্যান – প্রার্থনা মহৎ কবিতা বা শিল্প রচনার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে কী থাকলে বা কী পেলে যথেষ্ট হয় ? জানি না জানা নেই। তবে একথা জানতে পেরেছি রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা অসীম ও অভাবনীয় অবিরাম জাগরণ আত্মসমীক্ষা- আত্মিকদীক্ষা ও নিরীক্ষারই ফসল এবং মহানসম্পদ। আধুনিক কবির ব্যক্তি ও কবিজীবনের অবস্থানের অক্ষাংশ- দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় করে সুধীন্দ্রনাথের শেষ বক্তব্য এরকম : ‘ কবির ব্রত তাঁর স্বকীয় চৈতন্যের রসায়নে শুদ্ধ চৈতন্যের উদ্ভাবন।’ আর কবি শৈলেশ্বর ঘোষ বলেছেন : কবিতা সময়ের সারাংশ। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায় মানা না মানার। অনেক প্রশ্ন। শুধু প্রশ্ন আর প্রশ্ন – উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত দীর্ঘতম প্রশ্ন।
আমাদের প্রাচীন মমহীয়সী নারী ও মাতা বিজ্ঞতার উজ্জ্বলতম নক্ষত্র গার্গী নিপুণ প্রশ্ন করতে জানতেন। তার প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে খ্যাতনামা ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য বিরক্ত হয়ে গার্গীকে শাসনের সুরে বলেছিলেন : ‘ অতি বেশি প্রশ্ন করো না ‘। এই নিষেধকে দুটি অর্থে নিতে পারি: কবিদের জন্য এবং নারীদের জন্য। কবিদের জিজ্ঞসা বেশি। প্রশ্নতত্ত্বে সমাজ সংসারকে জর্জরিত করে জীবনের নির্যাস বের করে। যাজ্ঞবল্ক্য বা প্লেটো কবিদের ছাড়পত্র দিতে পারেন না। আর নারীতো শূদ্রের চেয়েও অধম। মনুস্মৃতিতে মানুষ শব্দই নাই – আছে শুধু চতুর্বর্ণের পুণ্যবাণ বৃত্তান্ত। অতএব নারীর জ্ঞানের বাচলতা যাজ্ঞবল্ক্যের কাছে অসহনীয় – বিদ্রোহের সামিল। অবশ্য সকল ধর্মেই নারী অবাঞ্চিত বাতুল।
কবি কালীকৃষ্ণ গুহ ‘ উত্তরের হাওয়ায় ‘ বলেছেন : সমস্ত প্রশ্নই ব্যক্তিকে অতিক্রম করতে চায়। ফলে কবি ও নারীর প্রশ্নে সমাজ চিরকালই চঞ্চল ও নিষেধের শাসনে উন্মাদ ও বর্বর।
লেখাটায় সমাপ্তি টানা প্রয়োজন। অতি জিজ্ঞাসা ভালো নয়। জীবনানন্দের কবিতার প্রতি মুগ্ধতা বিস্ময় ও অনুসন্ধিৎসা প্রকাশ করে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন : যে পথ নির্জন সেপথে তোমার যাত্রা।
রবীন্দ্রনাথের একটি অসাধারণ প্রবন্ধ আছে : নাম ‘মানবসত্য’। মানবসত্যে রবীন্দ্রনাথ বলছেন- মানুষের তিনটি জন্মভূমি আছে। প্রথম জন্মভূমি – পৃথিবী। দ্বিতীয় জন্মভূমি – স্মৃতিলোক। তৃতীয় জন্মভূমি – আত্মিকলোক। এই তিনে মিলে কবি ও মননের মানুষের ব্যক্তিগত চিত্তলোক ও বিশ্বগত চিত্তলোক। এই ব্যক্তিগত চিত্তলোক ও বিশ্বগত চিত্তলোকের দৃষ্টি দ্বন্দ্ব – সমন্বয় করে শঙখ ঘোষ উচ্চারণ করেছিলেন অমোঘ মহতের বাণী : আমাকে ভুবনে দাও আমি দেব সমস্ত অমিয়।
আপাতত আমি অমিয়ের সন্ধানেই আছি।
লেখক : কবি, শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা


আপনার মতামত লিখুন :

One response to “অমিয়ের সন্ধানেই আছি আমি / ফাউজুল কবির”

  1. Anjali Barua says:

    অসাধারণ লিখনি
    ফাউজুল কবিরের প্রণম্য এ লিখাটি কয়েকবার পড়েও মন ভরেনি। অনন্য লিখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *