শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১১:০১ অপরাহ্ন

মায়ের প্রতীক্ষা / পূর্বা চৌধুরী।

একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বর। চারদিকে বিজয়ের উপচেপড়া আনন্দ।ঘরে ফিরছে বাংলার দামাল ছেলে বিজয়ী মুক্তিসেনারা।সন্তানদের অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকা হাজারো মায়ের বুকে ফিরে আসছে ছেলেরা। খোকন। যে মায়ের পা ছুঁয়ে গভীর রাতে ঘর ছেড়েছিল যুদ্ধ করতে – সেই খোকনের মাও ছেলের অপেক্ষায় বসে আছে দাওয়ায়। পাশের গ্রামের করিম, বিলু, পল্টু, হারান কাকা সবাই ফিরল।হারান কাকার সাথেই তো খোকন যুদ্ধে যেতে ঘর ছেড়েছিল।সেই হারান কাকা মায়ের সামনে এসে দাঁড়াল। আমি তখন অনেক ছোট,ভাই আমাদের চার ভাই বোনের মধ্যে সবার বড়। দেশ স্বাধীন হলে আমাদের সে কি আনন্দ! হারান কাকা,আমাদের বাড়ী আসলে, মা আমার দৌড়ে গেলেন কাকার কাছে। ও হারান ভাই,আমার খোকন এসেছে? আসবে কখন? আমার যে আর অপেক্ষা সয় না ভাই! কও আমার ছাওয়াল কখন ফিরবে?হারান কাকার মুখ বেদনায় ছাওয়া। সে কী বলবে মাকে? না,মিথ্যে কথা বলতে পারবে না সে।এক শহিদ মুক্তিসেনার মাকে মিথ্যা কথা সে কখনোই বলতে পারবেনা। তখন চারদিক অন্ধকার হয়ে নেমে আসছিল আমাবস্যার আঁধার। সাঁঝের ঝাঁপসা আাঁধারে হারান কাকার মুখটা কেমন যেন বেদনামাখা তাই মা দেখতে পেল না।কিন্তু তার নীরবতায় বুঝতে পারল তার কাছে খোকন দাদার কোনো খবর নেই। মা,চেঁচিয়ে উঠলো, চুপ কইরা আছো ক্যান,আমার খোকন তো তোমার সঙ্গেই গেছিল।তারে সাথে কইরা আনলানা কেন? এবার হারান কাকা মুখ খোলে।সে জবাব দিল, শুনছি খোকন এক যুদ্ধে শহিদ হইছে,তার নাকি বুকে গুলি লেগেছিল।এর বেশি তো আমি কিছু জানি না বইন…এই কথা শুনে মায়ের বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে। সে চেঁচিয়ে ওঠে।না,আমার খোকন মরতে পারে না।সে আমারে কথা দিয়ে গেছে,দেশ স্বাধীন হইলে বিজয়পতাকা উড়ায়ে আমার কাছে আসবে। সে আসবেই,হারান ভাই তুমি কিছুই জানো না।তুমি যা শুনছ তা ভুল।হারান কাকা আর দাঁড়ায়নি।আাঁধারের ভিতর চুপিচুপি মায়ের কাছ থেকে নিঃশব্দে সরে যায়। এক,এক করে অনেক ছেলেই ফিরে এল মায়ের বুকে , আবার এল না অনেকেই। দিন যায়,মাস যায়, বছর গড়িয়ে কত বছর চলে গেল,মায়ের খোকন এল না।মা মানে না তাঁর খোকন শহিদ হয়েছে। মায়ের বিশ্বাস খোকন তাঁর একদিন ঠিকই আসবে ফিরে। মা অপেক্ষায় থাকে। অনেক বছর গড়িয়ে যায়,মায়ের ও বয়স বাড়তে থাকে,মাথার চুলগুলোতে পাক ধরেছে। বয়সের তোড়ে শরীর ভেঙ্গে পড়েছে। মায়ের চোখের দৃষ্টি ঝাঁপসা হয়ে এসেছে।মা,অপেক্ষায় তবু্ও দিন গোনে,তাঁর খোকা আসবে! তারপর আরো অনেক বছর কেটে যায়।প্রতি বছর বাঙ্গালির বিজয় দিবস আসে।মা এইদিন লাঠি ভর করে এক মাইল দূরে স্কুল মাঠে যায়। সেখানে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান হয়।বড়,বড় নেতারা এই দিনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন।তাদের কথায় মা তাঁর খোকনের বীরত্বের কথা শুনেছে।সেই কাহিনি শুনে মায়ের মনে হয়,সেদিন হারান কাকা মিথ্যে বলেনি।কিন্তু মা খোকনের জন্য,তাঁর বুকের মানিকের জন্য অনেক কেঁদেছিল। এখন আর কাঁদে না,যেন চোখের সব পানি শুকিয়ে গেছে তাঁর।তবে সবাই যখন তাঁকে শহীদ জননী বলে ডাকে,তখন গর্বে তাঁর বুকটা ভরে যায়। তাঁর খোকন দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে, শহীদ হয়েছে! বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মা সে। বিজয় দিবস,স্বাধীনতা দিবসে অনেক ছেলেমেয়েরা তাঁকে দেখতে আসে।সাংবাদিকরা তাঁর কথা শোনে।সেই কথা ছবিসহ ছাপানো হয় খবরের কাগজে। মা,এখন চোখে ভাল দেখতে পায়না।শুনে আর বলে,আমার বীর খোকন মরে নাই। সে আছে, লাল-সবুজের পতাকায়,গানে,কবিতায়, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণে। আবার এখনো অপেক্ষা করে,ঝাপসা চোখে তাকায় মাঠের পানে। বলে,খোকন আসবে…. খোকন আসবে …!


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *